Skip to content

অসুখ যখন ঘরে ঘরে, রাষ্ট্রের প্রস্তুতি কত দূর

ডেঙ্গুতে ৩০৮ মৃত্যু ও লক্ষাধিক রোগী হাসপাতালে, হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজনদের মধ্যে মৃত্যু ১,১৬৪। বিশ্বজুড়ে পরিবর্তিত রোগপ্রবণতা এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষার নতুন সংকটের মধ্যে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, রোগ ছড়ানোর পরে চিকিৎসা নয়, মানুষের জীবন বাঁচানোর আগাম প্রস্তুতি কতটা কার্যকর?

বাংলাদেশের জনজীবনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে ডেঙ্গু, অন্যদিকে হাম। দুটি ভিন্ন রোগ, সংক্রমণের দুটি ভিন্ন পথ। কিন্তু উভয়ের পরিণতি এসে মিলছে একই জায়গায়, হাসপাতালের শয্যায়, উদ্বিগ্ন পরিবারের অপেক্ষায়, চিকিৎসার ব্যয়ে এবং কখনো কখনো অকালমৃত্যুতে।

১২ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৮। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪৪২ জন। শুধু সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৬৭ জন এবং মারা গেছেন চারজন। সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। অক্টোবরের প্রথম এগারো দিনেও মৃত্যুর সংখ্যা ৬২। 

অন্যদিকে একই দিনের সরকারি হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে হাম নিশ্চিত হওয়া রোগীদের মধ্যে ১০৪ জন এবং হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন বা সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ৬০ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। দুটি শ্রেণি মিলিয়ে সংখ্যা ১ হাজার ১৬৪। তবে সন্দেহভাজন মৃত্যুগুলোকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। এই সময়ে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৫৭৩, আর সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৬ হাজারের বেশি। 

এই পরিসংখ্যান শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত হিসাব নয়। এগুলো একটি জাতির প্রতিরোধব্যবস্থা, চিকিৎসা অবকাঠামো এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে।

আমাদের দেশে উন্নয়নের আলোচনা হয় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা এবং প্রবৃদ্ধি নিয়ে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি শিশুকে প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করা না গেলে, একজন জ্বরাক্রান্ত মানুষকে সময়মতো চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে, সেই উন্নয়নের সুফল কতটা পূর্ণতা পায়?

রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু কত বড় অবকাঠামো নির্মিত হলো, তার হিসাব নয়। রাষ্ট্রের আরেকটি মৌলিক পরীক্ষা হলো, সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ হলো।

ডেঙ্গু শুধু ঢাকার সমস্যা নয়

একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে প্রধানত রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।

চলতি বছরের সংক্রমণের বিস্তার দেখাচ্ছে, ঢাকা ছাড়াও খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ১২ অক্টোবরের হিসাবে এক দিনে ঢাকা বিভাগে ৮৭১ জন, খুলনায় ২৯৮, চট্টগ্রামে ২৮৭, রাজশাহীতে ২৫৩ এবং বরিশালে ২৪৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 

এটি শুধু রোগের ভৌগোলিক সম্প্রসারণ নয়। আমাদের নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

এডিস মশা জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, পরিত্যক্ত পাত্র, ভবনের ছাদ, জমে থাকা বৃষ্টির পানি এবং অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

তবে সমস্যাটিকে শুধু নাগরিকের অসচেতনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। একজন নাগরিক তাঁর বাড়ির আঙিনা পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেন। কিন্তু শহরের বন্ধ নর্দমা, নির্মাণস্থলের পানি, পরিত্যক্ত সরকারি জমি কিংবা অপরিকল্পিত আবর্জনা ব্যবস্থাপনার দায় তাঁর একার নয়।

স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, নগর কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শেও মশার প্রজননস্থল নির্মূল, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু ফগিং বা কীটনাশক ছিটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আশা করা যায় না।

হামের প্রত্যাবর্তন আরও গভীর সতর্কসংকেত

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও হাম প্রতিরোধের জন্য বহুদিনের পরীক্ষিত টিকা রয়েছে। সে কারণে বাংলাদেশে হামের এত বড় প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রোগপ্রতিরোধের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এমনকি টিকাদান কর্মসূচির সামগ্রিক সাফল্যের মধ্যেও নির্দিষ্ট অঞ্চল, জনগোষ্ঠী কিংবা বয়সভিত্তিক শূন্যতা থেকে যেতে পারে।

বিশেষত যেসব শিশু নিয়মিত টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি কিংবা নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের ঝুঁকি বেশি। 

বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির ইতিহাস গৌরবের। কয়েক দশকের ধারাবাহিক উদ্যোগে শিশুমৃত্যু কমানো এবং বহু সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এই অর্জন অস্বীকার করা যাবে না।

কিন্তু অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়। টিকার সরবরাহ, সংরক্ষণ, কর্মীসংকট, তথ্য সংগ্রহ এবং পিছিয়ে পড়া শিশুদের শনাক্তকরণে সামান্য দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

সরকার ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভির সহযোগিতায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত কর্মসূচিতে মে মাসের মধ্যেই এক কোটি আশি লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরবর্তী সময়ে টিকার বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের সুরক্ষায় নতুন কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও কেন সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে, সেটি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।

জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের সংখ্যা বড় হলেও নির্দিষ্ট এলাকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু বাদ পড়ে যেতে পারে। আবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকলেও প্রকৃত সুরক্ষার হিসাব বিভ্রান্তিকর হয়।

এখন তাই শুধু কত শিশু টিকা পেয়েছে, সেটি জানালেই চলবে না। কত শিশু এখনও সুরক্ষার বাইরে রয়েছে, কোথায় রয়েছে এবং তাদের কাছে পৌঁছাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করতে হবে।

হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই কি সমাধান

ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তারের সময় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সরকারি হাসপাতালের ওপর।

হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়লে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষাগার, জরুরি ওষুধ এবং নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থার চাহিদাও বেড়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলো জনবল ও অবকাঠামোর মধ্যে অসামঞ্জস্য।

চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুমোদিত পদের প্রায় ২৯ শতাংশ তখন শূন্য ছিল। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ খালি থাকার তথ্য উঠে আসে। 

সরকার স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের বৃহত্তর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মাঠপর্যায়ে প্রায় ৩৫ হাজার শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

কিন্তু শুধু নিয়োগের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। কোথায় কত চিকিৎসক প্রয়োজন, কোথায় নার্স নেই, কোন উপজেলা হাসপাতালে পরীক্ষার ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, কোন অঞ্চলে জরুরি রোগী স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত, এসব প্রশ্নের উত্তর জেলা ও উপজেলা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের ওপর আস্থা বাড়াতে হবে। মানুষ যাতে অকারণে বড় শহরের হাসপাতালে ছুটে আসতে বাধ্য না হন, সেজন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার মান নিশ্চিত করা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য শুধু রোগী সুস্থ করে বাড়ি পাঠানোর মধ্যে নয়। রোগটি যাতে বিস্তৃত না হয়, সেই প্রতিরোধেও।

বিশ্বও একই সতর্কবার্তা দিচ্ছে

পরিবর্তিত আবহাওয়া, নগরায়ণ, আন্তর্জাতিক যাতায়াত এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে মশাবাহিত রোগের বিস্তার এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রতিবছর বিশ্বে ডেঙ্গু সংক্রমণের সংখ্যা আনুমানিক ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটির মধ্যে হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রোগটির বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ১১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে অস্বাভাবিক উষ্ণতা ও আর্দ্রতার কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। চলতি বছর লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টিতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮০ ছাড়িয়েছে।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস ও ডেঙ্গু একই রোগ নয়, এদের প্রধান বাহক মশাও আলাদা। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তিত পরিবেশ, মশার বংশবিস্তার এবং জনস্বাস্থ্য নজরদারির গুরুত্ব সামনে এসেছে। 

এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। শুধু রোগ দেখা দেওয়ার পরে ওষুধ ছিটানো নয়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মশার ঘনত্ব, রোগীর অবস্থান এবং সংক্রমণের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এখন বিলাসিতা নয়। এটি জীবনরক্ষার কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসুরক্ষার নতুন বিতর্ক

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন এবং নাগরিক ও অভিবাসীদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া ফেডারেল বিধিনিষেধের ফলে শরণার্থী, আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তি এবং আরও কিছু বৈধ অভিবাসী গোষ্ঠীর জন্য মেডিকেইডের ফেডারেল অর্থায়ন সীমিত হয়েছে। তবে গ্রিনকার্ডধারীসহ সব অভিবাসীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কিছু অঙ্গরাজ্য নিজস্ব অর্থায়নে বিকল্প স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, সরকারি সহায়তা কর্মসূচির ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং যোগ্যতার শর্ত কঠোর করা প্রয়োজন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, চিকিৎসার সুযোগ কমলে অনেক মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন না এবং পরবর্তী সময়ে আরও জটিল অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছাবেন। 

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এক নয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন উভয় দেশের জন্যই প্রাসঙ্গিক।

মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে রেখে সাময়িক ব্যয় কমানো গেলে, পরবর্তী সময়ে জটিল রোগের চিকিৎসায় সেই ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে কি না।

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতির নয়, মানবিক দায়িত্বেরও। বিশেষত বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে চিকিৎসার একটি বড় অংশের ব্যয় রোগীর পরিবারকে সরাসরি বহন করতে হয়, সেখানে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব আরও বেশি।

টিকা ও প্রযুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানের ভিত্তিতে

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে টিকা ব্যবহারের সম্ভাবনাও বাংলাদেশে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ৬ অক্টোবর রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশ ডেঙ্গুর টিকার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরনই সক্রিয় রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত আলোচনা। তবে টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অযথা বিলম্বও কাম্য নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দিষ্ট উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কিউডেঙ্গা টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। কিন্তু সব বয়সী মানুষের জন্য নির্বিচারে টিকাদানের সুপারিশ করেনি। 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই রোগের বিস্তার, বয়সভিত্তিক ঝুঁকি, টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, ব্যয় এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

টিকা কোনোভাবেই পরিচ্ছন্নতা, মশা নিয়ন্ত্রণ কিংবা দ্রুত চিকিৎসার বিকল্প নয়। বরং এসব ব্যবস্থার পরিপূরক।

প্রয়োজন দায়িত্বের নতুন কাঠামো

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখন অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন জরুরি।

প্রথমত, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু মৌসুমি পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সারা বছর মশার প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থল পরিদর্শন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, টিকাদান কর্মসূচির তথ্য আরও নির্ভুল করতে হবে। জন্মনিবন্ধন, স্থানান্তরিত পরিবার, বস্তিবাসী, দুর্গম অঞ্চলের শিশু এবং কর্মসূচির বাইরে থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করার বিশেষ ব্যবস্থা দরকার।

তৃতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জরুরি রোগী শনাক্তকরণ, পরীক্ষাগার, চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চতুর্থত, জনস্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

বর্তমান সরকার যে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, টিকাদান ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করাও জরুরি। পূর্ববর্তী প্রশাসনের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা থাকলে তার তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন হবে। কিন্তু অতীতের ব্যর্থতাকে বর্তমানের জবাবদিহি এড়ানোর অজুহাত বানানো যাবে না।

বিরোধী দল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকেও এই কাজে যুক্ত হতে হবে।

জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত কে কত কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে, সেই ভিত্তিতে। কে কাকে বেশি দোষারোপ করছে, তার ভিত্তিতে নয়।

জীবনই রাষ্ট্রের প্রথম অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং নানা রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি। এগুলোর প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি শিশুর জীবন রক্ষা, একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা এবং একটি পরিবারকে প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিপর্যয় থেকে বাঁচানোর প্রশ্ন কোনোভাবেই গৌণ হতে পারে না।

ডেঙ্গুর সর্বশেষ পরিসংখ্যান সতর্ক করছে। হামের বিস্তার আরও গভীর প্রশ্ন তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে, আগামী দিনের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ শুধু চিকিৎসকের চেম্বার কিংবা হাসপাতালের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এটি নগর পরিকল্পনা, শিক্ষা, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সমন্বিত বিষয়। আজ একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব।

কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে, এমন পরিবেশ ও প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে তাঁকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাসপাতালে যেতে না হয়।

এখানেই চিকিৎসাব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য। চিকিৎসাব্যবস্থা রোগের পর মানুষের পাশে দাঁড়ায়। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা চেষ্টা করে রোগের আগেই মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে। বাংলাদেশকে এই দ্বিতীয় কাজটিতে আরও সক্ষম হতে হবে।

উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা কেবল রাষ্ট্রের আয় বাড়ায় নয়, মানুষের অকালমৃত্যু কমায়। কেবল হাসপাতাল নির্মাণে নয়, রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতায়। কেবল বাজেট ঘোষণায় নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি শিশুর কাছেও সময়মতো টিকা পৌঁছে দেওয়ায়।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে জরুরি জনস্বাস্থ্য অঙ্গীকার হওয়া উচিত, প্রতিরোধযোগ্য রোগে যেন আর কোনো জীবন অবহেলার কারণে হারিয়ে না যায়।

কারণ রাষ্ট্রের শক্তির চূড়ান্ত পরিচয় শুধু তার অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে নয়।

তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষায় সে কতটা প্রস্তুত এবং কতটা দায়িত্বশীল। 

১২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক তথ্য, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণা মিলিয়ে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। 

Published inঅন্যান্য লেখা

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *