সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যে কাপুরুষোচিত ও আত্মঘাতী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি দেশের ওপর নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় আঘাত। হজ্জ ও ওমরাহ যাত্রীসহ শত শত নিষ্পাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং এই আন্তর্জাতিক চোকপয়েন্টগুলোকে অচল করার এই প্রচেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দাযোগ্য, অ্হআমরা তো তদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। একই সাথে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ও আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হুথিদের এই উগ্রপন্থা দমনে আরও কঠোর ও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন এবার বাংলাদেশের প্রবাসী পরিবারগুলোর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি হামলায় বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ থেকে ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন বলে একাধিক আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সর্বশেষ খবরে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি রয়েছেন।
রিয়াদ বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। এই বিমানবন্দর দিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ওমরাহযাত্রী ও আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল করেন। হামলার পর বিমানবন্দরটি ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। লুফথানসা, এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, ইতিহাদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের FAA এবং ইউরোপীয় বিমান নিরাপত্তা সংস্থাও সৌদি আকাশপথে সতর্কতা জারি করেছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, প্রথমে ড্রোন দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে পরে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়। সৌদি আরব এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে, কীভাবে এত বড় আক্রমণ বিমানবন্দরের প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারল। বাংলাদেশের জন্য এই ঘটনার গুরুত্ব বহুমাত্রিক।
প্রথমত, সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। লাখ লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করেন। শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার সরাসরি সৌদি আরবে কর্মরত স্বজনের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল। তাই রিয়াদের মতো কেন্দ্রীয় বিমানবন্দরে হামলা শুধু আন্তর্জাতিক সংবাদ নয়, বাংলাদেশি ঘরের উদ্বেগ।
দ্বিতীয়ত, বিমানবন্দর ও বেসামরিক অবকাঠামো এখন যুদ্ধের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। যুদ্ধ যদি সামরিক ঘাঁটির বাইরে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, বন্দর ও আকাশপথে ছড়িয়ে পড়ে, তবে প্রবাসী শ্রমিক, সাধারণ যাত্রী ও বেসামরিক নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।
তৃতীয়ত, এই হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে এমন হামলা প্রতিহত করা যায়নি। এ ঘটনায় শুধু সৌদি আরব নয়, পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে।
চতুর্থত, এর অর্থনৈতিক অভিঘাতও গুরুতর হতে পারে। সৌদি আকাশপথে অনিরাপত্তা তৈরি হলে বিমান চলাচল ব্যয়, বীমা, যাত্রী পরিবহন এবং প্রবাসী শ্রমিকের যাতায়াত ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে হুথি হামলা যদি তেল স্থাপনা, বন্দর বা জ্বালানি সরবরাহপথে আরও বিস্তৃত হয়, তবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও নতুন চাপ তৈরি হবে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম আবার ওঠানামা করছে।
এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরান শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইয়েমেন সংঘাত আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে গেলে এর চাপ শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বাংলাদেশের এখন জরুরি করণীয় হলো, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, নিহত ও আহতদের পরিচয়, ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তার ব্যাপারে দ্রুত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটকে শুধু সতর্কবার্তা দিলেই হবে না, হটলাইন, জরুরি সহায়তা ডেস্ক এবং আহত বা নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির নীরব স্তম্ভ। কিন্তু বিদেশে সংকট তৈরি হলে তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি অনেক সময় যথেষ্ট দৃশ্যমান হয় না। রিয়াদ বিমানবন্দরের হামলা সেই পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ নয়। কিন্তু সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা বাংলাদেশেরই দায়িত্ব।
রেমিট্যান্সের সময় প্রবাসীকে “যোদ্ধা” বলা সহজ। কিন্তু যুদ্ধের ঝুঁকিতে যখন সেই প্রবাসী বিমানবন্দর, কর্মস্থল বা আবাসস্থলে বিপন্ন হন, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু শোকবার্তা নয়—তৎপর সহায়তা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা।
রিয়াদের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ তাই ঢাকার জন্যও সতর্কবার্তা। বাংলাদেশকে এখন বুঝতে হবে, প্রবাসী নিরাপত্তা আর কেবল শ্রমবাজারের বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।
যে দেশে কোটি মানুষের পরিবার প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, সে দেশের জন্য বিদেশে প্রবাসীর জীবনরক্ষা আর পরোক্ষ বিষয় নয়। এটি সরাসরি জাতীয় স্বার্থ।


Be First to Comment