Skip to content

জ্বালানি সংকট শুধু যুদ্ধের ফল নয়, আত্মনির্ভরতার প্রশ্নও

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটকে শুধু আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কিংবা বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি অংশই দেখা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করেছে, এলএনজির দাম ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকও বলছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতায় বাংলাদেশ বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের জন্য আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা এখন উল্লেখযোগ্য। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি আন্তর্জাতিক সংকট কেন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে এত দ্রুত বিপর্যস্ত করে তোলে। এর উত্তর খুঁজতে হলে দীর্ঘদিনের জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতার দিকে তাকাতে হবে। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমেছে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো ক্ষেত্রের আধুনিকায়ন এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির গতি চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। পেট্রোবাংলার নথিতেও স্বীকার করা হয়েছে, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে নতুন উৎপাদন বাড়ালেও মোট চাহিদা পূরণ করা কঠিন হবে। 

এর ফলে এলএনজি আমদানি একটি সাময়িক সমাধান থেকে ধীরে ধীরে কাঠামোগত নির্ভরতায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক হিসাবে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। ২০২৫ সালে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা সরবরাহব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব দ্রুত শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। 

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কখনোই শুধু পেট্রোল পাম্পের হিসাব নয়। ডিজেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং পণ্যের বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ জ্বালানির প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি ধাপে ধাপে খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাদের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে একই গতিতে বাড়ে না।

সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনালের সমস্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। একটি অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে শত শত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প, বাসাবাড়ি ও পরিবহন খাতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ঘটনাটি দেখিয়েছে, সীমিত কয়েকটি আমদানি অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

সমাধান তাই কেবল আরও এলএনজি আমদানি নয়। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় অপচয় এবং সিস্টেম লস কমাতে হবে। তৃতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি উৎসকে বহুমুখী করতে হবে, যাতে একটি উৎসে সংকট দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থা বিপর্যস্ত না হয়। একই সঙ্গে শিল্পে জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি মজুত ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্ববাজারের মূল্যও বাংলাদেশ নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু দেশের জ্বালানি কাঠামো কতটা শক্তিশালী হবে, কতটা বৈচিত্র্যময় হবে এবং কতটা আত্মনির্ভর হবে, সেটি আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের বিষয়। বর্তমান সংকটকে তাই শুধু দুর্ভোগ হিসেবে নয়, একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমদানিনির্ভর সাময়িক সমাধানের বাইরে গিয়ে এখনই একটি বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি কৌশল গড়ে তুলতে হবে।

Published inঅন্যান্য লেখা

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *