কাজী শামসুল হক
দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ প্রত্যাহার জরুরী
মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোড়া হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল। গাজা উপত্যকা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং গাজার নিরীহ জনগণের ওপর চালানো নৃশংস হামলা বিশ্বব্যাপী মানবিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলের অমানবিক আগ্রাসনে আন্তর্জাতিক সমর্থন শান্তি প্রচেষ্টার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশেষে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হয়েছে।
ইসরায়েলের নৃশংসতায় মানবতার যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে তা মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক । গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়মিতই বেসামরিক হতাহতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালে গাজার ওপর অবরোধ আরোপের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের বিভিন্ন হামলায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব হামলায় স্কুল, হাসপাতাল, এবং বাসস্থানও ধ্বংস করা হয়েছে, যা ছিল নি:সন্দেহে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন। ইসরায়েলের দাবি, এই হামলাগুলো মূলত হামাস এবং অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হলেও বাস্তবে এর বেশিরভাগ শিকার হয়েছে নিরীহ জনগণ। ইসরায়েলের এই নৃশংসতার কারণে গাজাবাসী একদিকে যেমন জীবন হারিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে খাদ্য, ওষুধ ও নিরাপত্তার অভাবে চরম মানবিক সংকটে পড়েছে।
ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে আসছে বেশ কিছু দেশ, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের বৃহত্তম সামরিক এবং আর্থিক সহায়তাদাতা হিসেবে কাজ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা ইসরায়েলকে ‘আত্মরক্ষা’র অধিকার প্রদান করছে, তবে বাস্তবে এই সমর্থন ইসরায়েলের আগ্রাসনকে উস্কে দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশ যেমন যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর বিপরীতে, তুরস্ক, ইরান এবং বেশ কিছু আরব দেশ সরাসরি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই বিভক্তি গাজার সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগকে ব্যাহত করেছে।
যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ, মিশর, কাতার, এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো একাধিকবার মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে। তবে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আস্থাহীনতা এবং উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান এই প্রচেষ্টাকে প্রায়শই ব্যর্থ করেছে।
আমার পর্যবেক্ষণে ব্যর্থতার কারণসমূহের মধ্যে
১. ইসরায়েল ও হামাস উভয়ের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে জটিল করে তোলে।
২. দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক চাপের অভাব। ইসরায়েলের ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং হামাসকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার কারণে আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়।
৩. সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। উভয় পক্ষই নিজেদের জনগণের কাছে শক্ত অবস্থান দেখাতে চায়, যা যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টায় অন্তরায় সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে, মিশর এবং কাতারের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাস একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
তার পরও যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য যে প্রভাব তাতে আশাবাদ রয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি গাজার সাধারণ জনগণের জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে। এর মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্র্নিমাণ, খাদ্য এবং ওষুধ সরবরাহ পুনরায় চালু করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং গাজার ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ প্রত্যাহার জরুরি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মনে করেন যুদ্ধবিরতির সুযোগে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো কার্যকরভাবে খাদ্য, ওষুধ ও পানি সরবরাহ করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে গাজাবাসীর মধ্যে যে মানসিক ট্রমা সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনের জন্য কাজ শুরু করা যাবে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার সম্ভাবনা তৈরি হবে। গাজায় সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসন এবং গাজার ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকলে এই যুদ্ধবিরতি সাময়িক বলেই প্রমাণিত হবে। সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা এবং উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যায্য আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আজ অত্যন্ত জরুরি।শান্তির পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বৈষম্যমূলক নীতির অবসান এবং আস্থাহীনতার গণ্ডি ভেঙে দুই পক্ষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। শুধুমাত্র ন্যায্য ও মানবিক সমাধানের মাধ্যমেই গাজা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সম্ভব।
মঙ্গলবার , ২১ জানুয়ারি ২০২৫

Be First to Comment